দেশি ধানের ২১ নতুন জাত আবিষ্কার সেন্টু হাজংয়ের

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 12:25 PM, January 30, 2021

শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর :দেশি ধানের ২১টি নতুন জাত আবিষ্কার করে সফলতা পেয়েছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া
গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং (৪৫)। ব্রিডিং ও শংকরায়ণ পদ্ধতিতে নিজ হাতেই তিনি আবিষ্কার করছেন নতুন জাতের এই ধান। আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনের জন্য দেশি বিলুপ্ত জাতের ৩০-৩৫ ধরনের ধান বীজ সংরক্ষণ করেছেন তিনি।

তার বীজ ধান নিয়ে আশপাশের কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। তার আবিষ্কৃত সেন্টু শাইল চিকন জাতের ধানের ফলন ভালো হওয়ায় ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

মাটির গুণাগুণ ধরে রাখতে জৈব পদ্ধতিতে তিনি ছয় একর জমিতে দেশি জাতের ধান আবাদ করেছেন। গত বছর তিনি কৃষকদের কাছে ৫০ মণ সেন্টু শাইল বীজ ধান বিক্রি করেছেন। তার উদ্ভাবিত জাতগুলো খুবই আবহাওয়া সহিষ্ণু। একেকটা জাত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পাকে।এরমধ্যে কতগুলো ১১০ দিনে, কতগুলো ১২০ দিনে, কতগুলো ১৩০ দিনে বা ১৩৫ দিনে পাকে। তার উদ্ভাবিত ২১টি জাতের ধানের মধ্যে সাতটি ধানের নামকরণ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে সোনালু, সেন্টু গোল্ড-৫, মেরিগোল্ড, রানী শাইল, রুপাশাইল, সেন্টু শাইল ও বিশালি বিন্নি।

বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্ত হতে চলেছে—এমন বগি, হালই, গোলাপি, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল, খাসিয়াবিন্নিসহ বেশ কয়েক ধরনের আমন জাতের ধান চাষ করেন তিনি। বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে বঁাচানোর জন্য নিজের এক একর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান ট্রায়ালের জন্য লাগিয়ে রেখেছেন। নিজের ছয় একর জমিতে গোবর সার ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার দিয়ে সেন্টু শাইল, চিনিশাইল, তুলসীমালা, পাইজাম, ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নি ধান লাগিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানও বেশ ভালো হয়েছে।

সেন্টু চন্দ্র হাজং জানান, বেসরকারি সংস্থা কারিতাস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শঙ্করায়ন ও ব্রিডিং পদ্ধতিতে তিনি নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করেন। নিজের এক একর জমিতে ট্রায়ালও করেছেন। ব্রিডিং ও শঙ্করায়নের মাধ্যমে নতুন জাতের ধান আবিষ্কারের জন্য ২০ রকমের দেশি ধান লাগিয়েছেন। তার চাষকৃত ধানের জমিতে তেমন বালাইনাশক ব্যবহার করেন না।

তিনি আরও জানান, দেশি জাতের ধানে এমনিতেই পোকার আক্রমণ কম হয়। অন্যদিকে, কেঁচো কম্পোস্ট ও গোবর সার ব্যবহার করাতে ধানের গাছ শক্ত ও মজবুত হয়। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা উঁচু হলেও হেলে পড়ে না। সামান্য পোকার আক্রমণ হলে নিমপাতা, গোলঞ্চপাতা ও বাসকপাতা পানিতে ভিজিয়ে ফুটিয়ে তারপর মেশিনের সাহায্যে জমিতে স্প্রে করেন। পাশাপাশি জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ধানের উৎপাদন খরচও কম পড়ে। এসব দেশি জাতের ধান মোটামুটি ভালো হলে একরে ৪০ থেকে ৫০ মণ হারে উৎপাদন হয়।

সেন্টু চন্দ্র হাজং বলেন, ‘রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে দিন দিন জমির উর্বরা শক্তি হারিয়ে ফেলছে কৃষক।’তিনি জানান, ধান নিয়েই তার সব গবেষণা। ১৯৯১ সালে পরীক্ষা দিয়েও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। প্রায় ৩০ বছর ধরে কৃষি কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।আর প্রায় আট বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার গবেষণার কাজে সহায়তা করেন স্ত্রী অবলা রাণী হাজং।তিনি আরও বলেন, ‘দেশি জাতের ধানের আছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। এসব ধানের ভাত, পিঠাপুলি, মুড়ি বা এ ধরনের খাবার খেতে আলাদা স্বাদ। দেশি জাতের ধান যুগ যুগ ধরে কৃষকের কাছে থাকছে। আমি চাই দেশি জাতের ধানগুলো যেন তাড়াতাড়ি বিলুপ্ত না হয়ে যায়। এ জন্য কারিতাসের ট্রেনিং সহায়তায় আমার এই উদ্যোগ। আর নতুন নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করতেও আমার অলসতা নেই। বর্তমানে বেশ উৎসাহ নিয়ে কৃষিকাজ করছি।’

একই গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেন ও আন্ধারুপাড়া গ্রামের কৃষক হাবিল উদ্দিন বলেন, ‘সেন্টুর কাছ থেকে শঙ্করায়ণ করা সেন্টু শাইল জাতের ধান আবাদ করে বাম্পার ফলন পেয়েছি।’ ওই গ্রামের রত্নেশর বর্মণ জানান, সেন্টু শাইল জাতের চিকন ধান দুই একর জমিতে লাগিয়েছেন। এ জাতের ধানের বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়। তাছাড়া এ ধান একরে ৫৫-৬০ মণ হারে ফলন হয়। বাজারে চাহিদাও বেশ।

নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘সেন্টু চন্দ্র হাজং প্রতি বছরই দেশি জাতের ধান ট্রায়াল করে আবাদ করেন। তার আবিষ্কৃত দেশি জাতের ধান সেন্টু শাইলের ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে। দেশি জাতের ধান সংরক্ষণে তার উদ্যোগ খুবই ভালো। কৃষি বিভাগ থেকে সেন্টু শাইল ধানের উদ্ভাবক সেন্টু চন্দ্র হাজংকে পুরস্কৃত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’