ফিরে দেখা মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ‘৭১ঃ গুরুদাসপুর শত্রুমুক্ত হয়েছিল দুইদিন পর ১৮ ডিসেম্বর

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 7:54 PM, December 1, 2020

মো. আবুল কালাম আজাদঃ
আজ ১ ডিসেম্বর ২০২০। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের এই মাসে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল বীর বাঙালিরা।

চারিদিকে যুদ্ধের দামামা বাজছে। আমি তখন শিকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনির ছাত্র। বয়স ১০/১১ বছর হবে। আমার পিতা মরহুম আব্দুল জাব্বার মিয়া শিকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হওয়ায় এবং নেতৃস্থানীয় হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার নেতারা আমার আব্বার কাছে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন।

আর এ আলোচনা হতো আমারই পড়ার ঘরে। আমি ঐসব আেেলোচনা পড়ার ফঁাকে শুনতাম। যারফলে দেশের রাজনীতি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারি। তাই আমি শিশুকাল থেকেই রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শিখি এবং আমার মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়।

আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। আমি পাকিস্তানী সেনা শাসকের অধীন জাতীয় র্বিাচন দেখেছি। আমি জয়বাংলার শ্লোগান দিযেছি বুকফুলিয়ে ।আমি ঐতিহাসিক ৭ই মর্চের ভাষন শুনেছি। আমি রেডিওতে বঙ্গ বন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা শুনেছি। আমি রাজাকার, আলবদর, আলমুজাহিদ, আল শাম্স এবং পাকিস্তানীর দোসর পিস্ কমিটির নির্যাতন ,লুটপাট দেখেছি। আমি গুরুদাসপুরে পাকহানাদারের গনহত্যা দেখেছি। আমি স্বাধীনতার স্বপক্ষে গনজোয়ার দেখেছি। আমি মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি । আমি বিজয় দেখেছি। আমি বাঙ্গালী এবং স্বাধীন বাঙ্গলাদেশের স্বধীন নাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহন করছি। আমার স্বাধীন দেশের নিজস্ব মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছি।

আমার দেশের লালসবুজের পতাকা আছে যা, বিশ্বের বুকে পতপত করে মাথা উঁচিয়ে নিজের স্বাধীন দেশের পরিচয় জানান দিচ্ছে গর্বের সাথে। আমি মনের গভীর থেকে গর্বের সাথে আমার জাতীয় সঙ্গিত গাই-– আমার সোনার বাঙলা , আমি তোমায় ভালোবাসি।এজন্য আমি গর্ববোধ করি বিশ্বের দরবারে।

এই বিজয় আপনা আপনি আসেনাই।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের এক সাগর রক্ত আর ২লাখ মা-বোনের ইজ্জত এবং সাড়ে সাত কোটি দেশপ্রেমিক মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা এই গর্বিত বিজয়।

আর এই বিজয়কে আবারো ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি বিজাতীয় পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা ১৫ ই আগষ্ট ১৯৭৫-এ মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব পরিবারে হত্যা করে।ধিক্ ঐ অশুভ প্রেতাত্মাদের।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পরাজিত পাকিস্তানী খুনি সেনাবাহিনী যুদ্ধে পরাজয় বরন করে বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করলেও আমাদের গুরুদাসপুরে তার ব্যাতীক্রম ঘটে।গুরুদাসপুরের পাকিস্তানের দোসর রাজাকার-আল-বদরদের তখনও আশা ছিল পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত হয়নাই।

পাকিস্তান বাহিনীর ২ দিন পর১৮ ডিসেম্বর বীরদর্পে বীর মুক্তিযোদ্ধ্দের আগমনে পাক রাজাকারদের আত্মসমর্পনের মধ্যদিয়ে গুরুদাসপুর শত্রুমুক্ত হয় এবং মহান বিজয়লাভ করে।

১৮ ডিসেম্বর যেদিন গুরুদাসপুর শত্রুমুক্ত হলো ঃ
বিবিসি. ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবানী কোলকাতা এবং স্বাধীনতাকামি বাঙালীর প্রিয় স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন মাধ্যমে ঘোষনা করা হলো ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়দর্ী উদ্যান)ময়দানে পরাজিত পাকসেনারা বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পন করেছে। এখবর শোনার পরও গুরুদাসপুরের মানুষ বিজয় মিছিল করতে পারেনাই পাক রাজাকার আর দালালদের ভয়ে।

১৭ ডিসেম্বর চারিদিকে খবর ছড়িয়ে পড়লো আগামীকাল ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা গুরদাসপুর থানা আক্রমন করবে। আমি ঐদিন বিয়াঘাট মামার বাড়িতে ছিলাম। বিয়াঘাটের মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে আগামীকাল মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যর্থনা জানাতে সাজ সাজ রব উঠে। আমিও ওদের সাথে যোগ দেই। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর শতাধিক মানুষ লাঠি, ফালা, সড়কি, ঢাল, তলোয়াড় নিয়ে জয়বাংলা, জয়বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে গুরুদাসপুর থানার দিকে আসার পথে আরো জনগন লাঠি ফালা নিয়ে শত শত মানুষ যোগ দেয়।
থানার সামনে এসে দেখি বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু মানুষ আমাদের মত দল বেধে লাঠি সড়কি ঢাল নিয়ে এসেছে। কচুগাড়ি –ধারাবারিষা, শিধুলি হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা গুরুদাসপুরে আসছে জানতে পেড়ে তঁাদের অভ্যর্থনা জানাতে বিশাল মিছিল ধারাবারিষার দিকে এগোতে থাকে। মিছিল পঁাচশিষা-চলনালী যেতেই দেখি ধুলা উড়িয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা দুর্বার গতিতে এগিয়ে আসছেন।

আমরাও মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে অভ্যর্থনা জানাই এবং রাস্তার দুই পাশে দঁাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যাওযার পথ করে দেই।

বীরের বেশে আমাদের গর্বিত মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেনেড হাতে চাইনিজ রাইফেল, ষ্টেনগান, এসেলারসহ বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে দিতে মার্চ করে থানার কাছে গিয়ে থানার চতুর্দিকে ঘিরে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে পজিশন নেন।এদিকে কমান্ডার আবু বক্কার সিদ্দিক, ডেপুটি কমান্ডার তোফাজ্জল হোসেন এর নেতৃত্বে একদল মুক্তিয়োদ্ধা থানার ভিতর গিয়ে থানায় অবস্থানরত ওসিসহ পুলিশ, রাজাকারদের নিরস্ত্র করে থানার অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রনে নেন এবং মুক্তিযোদ্ধা জেলে রশিদ( জল্লাদ জেলে রশিদ নামে পরিচিত) থানার ছাদে উঠে এসেলার দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে গুরুদাসপুর থানা শত্রুমুক্তির ঘোষনা করার সাথে সাথে থানার চারিদিক থেকে চাইনিজ রাইফেলের ফঁাকা

ফায়ারের মুহর্মমহু শব্দে বিজয় ঘোষনা করা হলো।সেই সাথে সমবেত জনগন জয়বাংলা শ্লোগানে শত্রুমুক্ত থানা এলাকা প্রকম্পিত করে তুলে। এইদিনের বিজয়ের অভিযানে অংশ নিতে পেরে নিজেকে সবসমই গর্বিত মনে করি।সেই স্মৃতি স্মরণ করে আজো আনন্দে আপ্লুত হই।
# মো. আবুল কালাম আজাদ#সভাপতি, চলনবিল প্রেসক্লাব, এবং বার্ত সম্পাদক, দৈনিত দিবারাত্রী, গুরুদাসপুর, নাটোর