সোজা কথায় নজরুল

Desk Reporter
Desk Reporter
প্রকাশিত: ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২১

-মৃধা মোহাম্মদ আল-আমিন:

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ এবং নানা প্রতিভার অধিকারী একজন ব্যক্তি হিসাবেই আমরা নজরুলকে চিনি বা জানি। নানা গুনে গুণান্বিত নজরুল ছিলেন একজন সদা জাগ্রত ও সমাজের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। এই মহাপ্রাণকে নিয়ে লেখা আমার মতো সামান্য মানুষের জন্য অনেকটা তার প্রতি প্রবঞ্চনা করার শামিল।

তারপরও বিবেকের তাড়না সামলাতে না পেরে অদক্ষ হাতে এই গুনীজনের বিষয়ে লেখার অপচেষ্টা আপনাদের সমীপে রাখলাম। একটা লেখা শেষ হওয়ার পর তার শিরোনাম ঠিক হয়, না শিরোনাম ঠিক করে তারপর লিখতে বসতে হয় সেই বিষয়ে তর্কে যাবো না। নিয়মের তোয়াক্কা না করে আগে আমি শিরোনামই ঠিক করে ফেললাম।

তার অন্যতম কারণ হলো, শিরোনাম ঠিক করা না থাকলে আমি লেখাটা গুলিয়ে ফেলব, যা আমার অযোগ্যতা মাত্র। অনেক প্রাবন্ধিক, আলোচক, সমালোচক, কবি, সাহিত্যিক, গুনীজন নজরুল সম্পর্কে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করে গেছেন। আমি হয়ত অতোটা বিশ্লেষণ করতে পারবো না।

তাই এর শিরোনামই ঠিক করলাম : “সোজা কথায় নজরুল”। বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি আরো কত ভাবেই না নজরুলকে আমরা জানি। আমরা কখনো কি ভেবে দেখেছি, আসলে নজরুল কিসের কবি? আসলে নির্দিষ্ট কোন বিশেষণে নজরুলকে বাঁধা যাবে না। কারণ তাহলে দেখা যাবে নজরুল কোথায় যেন আটকে আছে। কারণ নজরুল এক বিশেষণে তো দূরে থাক, এক স্থানেও কখনো আটকে থাকেনি।

আবার তার কোন একটা লেখা দিয়েও তাকে বিচার করা যাবে না। যেমন নজরুল লিখেছেন : “আল্লাহ্ আমার প্রভূ, আমার নাহি নাহি ভয়/আমার কিসের শঙ্কা? কুরআন আমার ডঙ্কা/ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়। -এখানে নজরুলকে একজন ইসলাম প্রিয় মানুষ বলেই মনে হবে।

 

 

কিন্তু যখন লিখলেন: “কে পড়ালো মুন্ডু মালা/আমার শ্যামা মায়ের গলে। সহরদল জীবন- কমল/দোলেরে যার চরণ তলে।” এখন নজরুলকে কি বলা যায়? যেমন তিনি রচনা করে গেছেন শ্যামাসংগীত, তেমনি নজরুল একই হাতে লিখেছেন গজল। বাংলা গজল গানের জনকও কাজী নজরুল। কারণ নজরুল কোন গন্ডীর কাছেই বন্দি ছিলেন না। তাই এই অর্থে তাকে একজন প্রকৃত মুক্তমনা বা সৃষ্টিশীল মানুষ হিসাবে ধারণা করা যায়।

কোনকিছুই তাকে আটকে রাখতে পারেনি। নজরুলের জীবনের সব কিছুই যেন দ্রুত পরিবর্তন হয়ে গেছে। কোন কিছুই তাকে বাধ্য করতে বা অনুগত করতে পারেনি। তাই এখানে এক অর্থে বলাই যেতে পারে আসলে নজরুল’ই প্রকৃত অর্থে স্রষ্টাকে জানতেন। যার কারণে অনেকে তাকে এখনো একজন সূফী মনে করেন এবং তাকে ‘সূফী নজরুল ইসলাম’ হিসাবে সম্মোধন করে থাকেন। আমি তাকে তাও বলতে চাই না। তাহলে নজরুল হয়ত সেখান থেকেও চলে যেতে পারে! কারণ তিনি এমনই একজন বাঁধভাঙ্গা স্বভাবের মানুষ ছিলেন চিরকাল।

নজরুলের বিরুদ্ধে মুসলমানরা ঝাড়ু মিছিল করে থাকতে পারে, তবে তার লেখা গজল ছাড়া তাদের মজলিস, জলসা অপূর্ণ থেকে যায়। কালীপূজায় যারা শ্যামাসংগীত গাইছেন তারা হয়ত জানেই না তাদের এই ভক্তিগীতি ভূমিষ্ট হয়েছে নজরুলের কলম থেকে।

আজন্ম মানবতাবাদী এ মহাপ্রাণ, মানুষের স্থান রেখেছেন সব কিছুর উপরে। যা তাঁর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সম লেখনীর মাধ্যমে আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয়। তাইতো নজরুল বলেছেন, “পূঁজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ:- গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো। প্রকৃতপক্ষে বা সোজা চোখে ইহাই নজরুল।

মসজিদ, মক্তব, মাজার, লেটোর দল, স্কুল কত স্থানের অভিজ্ঞতা নজরুলের ঝুলিতে। নজরুল যখন সেনাবাহিনীতে চাকরী করত তখন তার লেখা ছাপা হত হাবিলদার নজরুল ইসলাম নামে। এই সময়েও নজরুল অনেক কবিতা-গান লেখেন যা পরবর্তিতে অনেক বিখ্যাত হয়েছিল।

 

 

সাংবাদিকতা, রাজনীতি কোথায় পদচারণা নেই নজরুলের। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক সম্পাদিত পত্রিকায় লিখেছেন নজরুল। নবযুগ, ধুমকেতু এসব পত্রিকা নজরুলের জ্বালাময়ী লেখাগুলোকে ধারণ করে প্রকাশিত হতো। রাজনীতিতেও নজরুল অংশগ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বরাজ’ নামক সংগঠন। নজরুল রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন মূলত তুরস্কের মহানায়ক কামাল পাশার কাছ থেকে। কামাল পাশাকে নজরুল তার জীবনের মহানায়ক মনে করতেন।

তিনি মনে করতেন তুরস্কের সেই মুসলমানরা যদি কুসংস্কার মুক্ত হতে পারে তবে আমরা কেন পারবোনা। যখন তুরস্কের সেনাবাহিনীর কান্ডারী, মহাবাহু, বিশ্বত্রাস কামাল পাশা যুদ্ধ জয়ের পর বিজয়ীর বেশে ফিরছেন, তখন নজরুল লিখলেন: “এই ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের, দামাল ছেলে কামাল ভাই/অসুর পুরে শোর উঠেছে, জোর সে সামাল- সামাল তাই/কামাল তু নে কামাল কিয়া ভাই।”

নজরুলের প্রতিটা লেখা তার অন্তরের ভাষার বহিঃপ্রকাশ, তাতে কোন প্রকার প্রভাবিত হওয়ার লেশ নেই। নজরুল’ই বরং তার অন্তর নির্গত কথার মাধ্যমে তৎকালীন, বর্তমান এবং সামনের অনেক কিছুকে প্রভাবিত করেছেন, করবেন। তিনি কবে বিদ্রোহী না ছিলেন।

অত্যাচার, জুলুম, নির্যাতন দেখলেই নজরুল তাঁর কলাম চালাতেন কামানের গোলার মতো।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় নজরুল লিখলেন: “শালা দেশ ছাড়বি কিনা বল/না ছাড়িলে কিলের চোটে হাল করিব জল।” এমন বাক্যগুলো কেবল সেই বলতে পারে, যে কেবল এইভাবে দেশকে উপলব্ধি করতে পারে।

দেশের দুর্বিসহ অবস্থা এবং মানুষের কষ্ট, যার সাথে আছে উপনিবেশবাদের চাবুক। নজরুল এইভাবে, বলতে গেলে সময়ের প্রয়োজনে লিখে গেছেন কোটি মানুষের মনের কথা। যার জন্য রাজদ্রোহী হিসাবে নজরুল জেলে ছিলেন। আত্নপক্ষ সমর্থন করে নজরুল যে বক্তব্য সেদিন এজলাসে দিয়েছিলেন, তাও কঠিন সাহিত্য বটে। যা পরবর্তিতে একটি প্রবন্ধ হিসাবে ছাপা হয় (রাজবন্দীর – জবানবন্দি)।

এসময় নজরুলের কলম থেকে বের হয়ে এসেছে: “কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট/রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণ বেদী।” নজরুল বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের সাথে নজরুলের ছিলো আত্নিক সম্পর্ক।

 

 

নজরুলের অনেক কবিতা-গান মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। নজরুল যেন তাঁর লেখায় বাংলাদেশকে বন্দনা করেছেন। তার লেখা “নমোঃ নমোঃ নমোঃ বাংলাদেশ মম/চির মনোরম চির মধুর।” এ লেখার মাধ্যমে নজরুল তাঁর বাংলাদেশের প্রতি মমত্ববোধের জানান দেয়।

নজরুল তার অন্তরের সরল ভাষা প্রকাশের জন্য এক অনন্য স্বতন্ত্র ব্যক্তি। সাংবাদিকতা, রাজনীতি, চাকরী এত সব স্বত্ত্বেও নজরুলের লেখা থামেনি। আবার এমন হতে পারে নজরুলের লেখাই নজরুলকে কোন স্থায়ী পেশায় বাঁধতে পারেনি।

স্রোতস্বিনী নদীর মত নজরুল বয়ে চলেছেন সময়ের স্রোতে। তার পারিবারিক জীবনেও সে যে বহমান তার প্রমাণ রেখে গেছেন। কুমিল্লা গেলেন আকবর খানের সাথে তার বাড়িতে। সেখানে আকবর খানের বোন নার্গিস আসার
খানমের সাথে তার বিয়ে ঠিক হলো। উভয়েরই সম্মতি আছে, কিন্তু আকদের পর বাঁধলো ঝামেলা।

কাবিনে নজরুলকে ঘরজামাই থাকার শর্ত দেয়া হলো। তিনি একরকম পালিয়ে আশ্রয় নিলেন বিরজা দেবীর বাড়িতে। সেখানে তার সাথে পরিচয় হলো প্রমিলা দেবীর সাথে। তারপর প্রমিলা দেবীর সাথে নজরুলের বিয়ে হয়। এরকমই প্রাণবন্ত এবং স্বনির্মিত মানুষ ছিলেন কাজী নজরুল। প্রকৃত অর্থে নজরুল ছিলেন সকল রকমের পরাধীনতার শিকল ছিন্ন করার মূর্ত প্রতিক।

তার রচিত বিভিন্ন কবিতা-গানে নারী চরিত্রের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো।

যেখানে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে নারী প্রেম। তাই নজরুলকে প্রেমের কবি বললেও ভুল বলা হবে না। “মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল/কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতি চাঁদের দুল।” তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ।” এভাবে শুধু নজরুলই বলতে পারে। তৃতীয়া তিথির চাঁদ যে কানের দুলের মত, তা যেন নজরুলের এক অনবদ্য আবিস্কার। সে তার প্রিয়াকে সাজাবে কোন অলংকারে নয়, বেলী ফুল দিয়ে। কখনো নজরুলের প্রাণ আটকে গেছে তার প্রিয়ার খোঁপার মধ্যে। প্রেমিক নজরুল এভাবেই তার প্রিয়াদের উপমায়-উপমায় রঙ্গিন করে রেখেছেন।

 

 

সাম্য, মৈত্রী, বন্ধনের কবি হিসাবে নজরুল আরো বড় অগ্রগামী সৈনিক। রেলের মধ্যে কুলিকে গালি দেয়া বাবুও নজরুলের লেখা থেকে নিস্তার পায়নি। নিস্তার পায়নি বড়লোকের আদুরে সন্তান ও তার মায়েরা। নজরুল যেন আজীবন বলে যাচ্ছেন মা হলো সার্বজনীন।

নজরুলের চোখে নারী-পুরুষ সবাই সমান। নারী পুরুষের দাসী না, সংসারে যে নারীর ভূমিকা অপরিহার্য তা নজরুল হয়তো খুব গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন। কেবলমাত্র সংসার না বাহিরের জগতে নারী কত অবদান রেখেও তুচ্ছ হন, তাদের কথা কেউ মনে রাখে না তা নজরুলের চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনি। তাইতো নজরুল লিখলেনঃ “কোন রণে কত খুন দিলো নর, লেখা আছে ইতিহাসে/কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।” তিনি নিজের অন্তরে সবসময় একটা স্বাধীন ভাব বজায় রাখতেন বলে, তার লেখাগুলো ছিলো মুক্ত পাখির মত।

কোন অন্যায় নজরুলের লেখা থেকে বাঁচতে পারেনি। কিভাবে পারবে, নজরুল তো মহাপ্রলয়ের নটরাজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাবানল। নজরুলের জীবনে তার আমার আমিকে চেনা যায় তার মহাসৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে। তাঁর জীবনে ইহা একটি বিস্ময়কর লেখা, তা বললে মোটেই ভুল বলা হবেনা। তিনি ভয়ের উৎসে আঘাত করে গেছেন।

তিনি আহবান করে গেছেন অধিকার ছিনিয়ে নিতে আসতে। সারা পৃথিবীতে সবসময় জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার ছিলো এবং তাকে কিভাবে পদদলিত করতে হবে সে পন্থা নজরুল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। নজরুল আজীবন বৃটিশদের ভূত মনে করতেন।

তাইতো নজরুল ভূত ভাগানোর গান শুনিয়ে মানুষের দুইশো বছরের ঘুম ভাঙ্গাতে পেরেছিলেন। মেহনতী, শ্রমিকের প্রাণের কথা নজরুল বলতে পারতেন। তাই নজরুলকে কোন বিশেষণে না বেঁধে তাকে স্ব-গতিতে চলতে দিলে নজরুলই তার আপন পথের কান্ডারী। আর ইহাই সোজা কথায় নজরুল।