প্রসঙ্গ:মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই হোক এবার সেনা ছাউনিতে।

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 11:16 PM, December 13, 2020

রানা চৌধুরীঃ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা চুরান্ত করতে এবার যাচাই বাছাই হোক সেনা ছাউনিতে।মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে আবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে গেজেট ভুক্ত প্রায় ৫৫ প্রায় হাজার মুক্তিযোদ্ধার সব ধরণের তথ্য আবার বাছাই করা হবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় চার সদস্যের যাচাই ও বাছাই কমিটি গঠন করা হচ্ছে।কিন্তু না,আর নয় উপজেলাতে এবার যাচাই বাছাই হোক ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আর্মী সেনা ছাউনিতে। আর এখানে এই বাছাই কমিটির কর্মকর্তা হবেন শুধুমাত্র আর্মী পার্সন অফিসার।বাছই কার্যক্রম চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী,সচিব এবং যামুকার নেতাসহ কাউকে ভেতরে এ্যালাউ করা যাবেনা।পাশা-পাশী যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা এই পর্বে অংশ নিবেন তারা ব্যতিত সাফাই গাওয়ার জন্য প্রার্থীর পক্ষের কোন ব্যক্তির প্রবেশাধীকারও সেখানে থাকবেনা, আর থাকার প্রয়োজন আছে বলেও আমি মনে করিনা।

কর্তৃপক্ষ সুক্ষ্ণভাবে বাছাই কার্য শেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রতিবেদন পঠিয়ে দিবেন। যে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধ সে তার নিজের বিষয়ে নিজেই যথেষ্ট।কেউ সাফাই গাইলেই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভুয়া হয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই আর অমুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবে এটাতো অসম্ভব।কিন্তু কেন যেন মনে হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনিয়মটাই যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে।যদি তাই না হয় তবে স্বাধীনতার এতো বছর পরেও জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এ তালিকা এখনো চুরান্ত হলোনা কেন?

সব শেষ ২০১৭ সালের যাচাই বাছাই নিয়েও রয়েছে হাজারো বিতর্ক। এ বাছাই পর্বে কমিটির সর্ব সম্মতিক্রমে যাদেরকে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চুরান্ত তালিকা তৈরী করে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে-যথারিতি ভাতাও বন্ধ করেছেন কর্তৃপক্ষ,অথচ মহামান্য হাই-কোর্টে রিট করার পর সেই ভাতা আবার চালু হয়েছিল,তবে সেটি আবার স্থগিতও করেছেন।এখন প্রশ্ন হলো,বাছাই কমিটি ঠিক-নাকি মুক্তিযোদ্ধা? হাই-কোর্টের রিটের আদেশ সঠিক নাকি কর্তৃপক্ষের স্থগিতাদেশ?

একটি উদাহরণ না দিলেই নয়,একজন ছাত্র কোন শ্রেণীতে পড়ে?ওই শ্রেণীর কতগুলো বই,কোন কোন স্যার তাদের কি কি ক্লাস নিয়ে থাকেন? বছরে কয়টা পরীক্ষা হয়ে থাকে ইত্যাদী।অনুরুপভাবে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাও জানেন যে,সে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে গেছেন,কোথায় ট্রেনিং করেছেন,কি ট্রেনিং করেছেন,কারা তাদের ট্রেনিং করিয়েছেন,তৎকালীন সেখানে কমান্ডার কে ছিলেন,ট্রেনিং শেষে সনদ পেয়েছেন কি না? অথবা কার সাক্ষরিত সনদ,মুক্তিবার্তা বা লাল বই-এ নাম আছে কি না এবং ট্রেনিং শেষে কোথায় যুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধ শেষে হাতিয়ার কোথায জমা দিয়েছে ইত্যাদী?

এ সব তখ্য উপাথ্য বা যাবতিয় বিষয়গুলি উপস্থাপন অথবা বালার জন্য ভাড়াটিয়া সাক্ষীর কি প্রয়োজন? কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি যাচাই বাচাই পর্বে এসব মৌখিকভাবে বলতেই না পারে তবে তাকে সনদ দিয়ে প্রমানের কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কি? কারন সে যুদ্ধ করেনি তাই সে জানেনা। আর যদি সে জানেনা কিছুই কিন্তু দালিলিকভাবে প্রমান করার জন্য যে কোন কাগজ পত্র উপস্থাপন করে তবে সেগুলো নি:সন্দেহে ভুয়া। কেননা সে যুদ্ধ আদৌও করেনী,সে অনেক ছোট বয়সে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, তাই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার নুন্যতম বয়সও তার সে সময় হয়নি বিধায় সে শুধূমাত্র ভুয়া দলিল সংগ্রহ করেছে।আর না হয়-সে না করেছ,না দেখেছে এই মহান মুক্তিযুদ্ধা।

তথ্য আছে যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করে তাদের তথ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।কিন্তু এই সময়টিছিল ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আপত্তি এনে বলেরছ যে এই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করার সময় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন -২০০২ যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়, রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ পবিত্র আমানতের খেয়ানত হয়ে যাচ্ছে অথচ আজ বলা হচ্ছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন -২০০২ অনুসরণ করা হয়নি। যার ফলে প্রায় ৫৫ হাজার গেজেট ভুক্ত এই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তাদের পক্ষ থেকে উপজেলা ভিত্তিক যাচাইকরণ নির্বাচীত কমিটির কাছে তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। অন্যথায় তাদের গেজেট প্রশংসাপত্র বাতিল এবং ভাতাও বন্ধ হয়ে যাবে।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের তথ্যমতে, মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিতকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সঠিক তালিকা সংকলন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৪৪হাজার মুক্তিযোদ্ধা বিএনপির শাসনামলে এবং ১১ হাজার আওয়ামী লীগের শাসনামলে গেজেট ভুক্ত করেছিলেন। সরেজমিন বিভিন্ন সময় যাচাই-বাছাই ও উপজেলা কমিটি নির্বাচনের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে উঠে আসা লোকের সংখ্যা গেজেটে নিবন্ধিত ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশি। এমনও দেখা গেছে যে কেউ আবেদন লিখেছেন এবং জমা দিয়েছেন, তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন।

সুতরাং, আমি মনে করি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটি পুনরায় চেক করার জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত সঠিক।সঠিক যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা চূড়ান্ত করা অত্যান্ত জরুরী। দুর্ভাগ্যজনক যে,স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে আসার পরেও এখন পর্যন্ত আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল,স্বচ্চ এবং গ্রহনযোগ্য তালিকা পারিনী।

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির সেরা সন্তান। তারা সর্বোচ্চ সম্মান এবং মর্যাদার অধিকারী। তারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং শোষণমুক্ত সমাজের জন্যই লড়াই করেছিল। এমনকি এখনও এমন অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আছে যারা প্রশংসাপত্রটিও গ্রহণ করেননি সুযোগ-সুবিধা-ত- দুরের কথা। আর এখন মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়েও অনেকে প্রতারণার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার মতো মহান তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তারা অবশ্যই এটা অমার্জনীয় জঘন্য অপরাধ করেছেন। এমনকি এ ধরনের নজির প্রশাসনের উচ্চ স্তরেও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দীর্ঘদিনে দাবি ছিল যে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে ভুয়া বা অমুক্তিযোদ্ধাদের অপসারণ করা উচিৎ। যদিও দেরিতে হলেও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে – আমি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে স্বাগত এবং সাধুবাদ জানাই।

তবে মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অবশ্যই যত্নবান হতে হবে।কোন করনে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যদি এই বাছাই প্রক্রিয়াতে বাদ পড়ে যায় তবে এটি হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য কলঙ্কজনক। মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নিয়ে যাদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাদেরকে অবশ্যই এই তালিকা থেকে সরিয়ে দিতে হবে।পাশা-পাশী দূরদর্শীতার সাতে একটি বিষয় অবশ্যই সামনে আনতে হবে তাহলো যে সমস্ত অমুক্তিযোদ্ধা-মুক্তিযোদ্দা বনে গেছে,তারা কখনো কোন কমান্ডার,না হয় স্থানীয় এমপি অথবা কোন মন্ত্রী,নয়াতো মুক্তিযোদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়.সচিবালয়,যামুকা,স্ব-স্ব এলাকার সমাজসেবা,উইএনও অফিস এবং যাচাই বাছাই কমিটি ইত্যাদীর কারো না কারো হাত ধরেই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে।সেহেতু তাদেরকেও চিহ্নিত করে সাস্তির আওতায় আনতে হবে। সর্বপরি মনে রাখা প্রয়োজন একটি মুক্তিযুদ্ধ মনেই একটি পবিত্র অধ্যায়। একটি মুক্তিযুদ্ধ মনেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ মুক্তিযুদ্ধ মনেই একটি মানচিত্র এবং লাল সবুজের পতাকার দেশ-আমাদের মাতৃভূভি বাংলাদেশ।

আর যারা এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে মূলত তারাই দেশ প্রেমিক এবং দেশ জাতীর শ্রেষ্ঠ সূর্য সন্তান।সুতরাং কে কোন দলের,কোন মতের এটা বিবেচ্য বিষয় নয়,কে মুক্তিযোদ্ধা বাড়িয়েছে আর কে কমিয়েছে এটা হিসেব নয়।আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা নিয়ে আর কোন বিতর্ক দেখতে চাইনা।যারা প্রকৃত তারাই থাকবে আর যারা ভুয়া তাদের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে চীর তরে মিশে যাবে। আর সে লক্ষে ভুয়াদের,অপসারন,সঠিকদের সংরক্ষণ,মুক্তিযুদ্ধকে মূল্যায়ন ও পূর্ণাঙ্গ এবং চুরান্ত তালিকা প্রনয়নের স্বার্থে সেনা ছাউনিতেই এ যাচাই বাছাই হওয়াটা খুবী জরুরী বলে আমি আবারো মনে করি।যাদের জন্য পেয়েছি এ দেশ,এরা বীর,এরা শ্রেষ্ঠ,এরা অম্লান এদের অবদানের নেই কোন শেষ।

সাংবাদিকঃ লেখক ও কলামিস্ট