নরসিংদীর রায়পুরায় অশান্ত চরাঞ্চলে কেন শান্তি ফেরে না?

Desk Reporter
Desk Reporter
প্রকাশিত: ৯:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২১

সাইফুল ইসলাম রুদ্র, নরসিংদী: নরসিংদীর গোটা চরাঞ্চল। স্থানীয় তুচ্ছ ঘটনা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে চরাঞ্চলবাসী। এসব সংঘর্ষে টেঁটা বল্লমসহ দেশিয় অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন করে ব্যবহার হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। এতে প্রাণহানিসহ বাড়িঘরে
পাল্টাপাল্টি লুটপাট ও অগ্নিসযোগে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

যুগযুগ ধরে চলে আসা এসব সংঘর্ষময় পরিস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিলেও শান্তি ফেরাতে পারছে না স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও প্রশাসন কেউ।

পুলিশ চরাঞ্চলের এসব সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না বলে মনে করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু।
চরাঞ্চলের বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দা, লাঠি-বল্লম-ঢাল সংঘর্ষের হাতিয়ার হলেও নরসিংদীর চরাঞ্চলে টেঁটার ব্যবহার অনেক আগে থেকেই। একটা সময় সময় নদ-নদীতে মাছ ও কচ্ছপ শিকারের জন্য ব্যবহৃত এই টেঁটা এখন চরাঞ্চলে মানুষ শিকারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

যুগের হাওয়ায় শুধু টেঁটা-ই নয়, সংঘর্ষে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ককটেল, বোমাসহ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। টেঁটার পাশাপাশি বেশির ভাগ মানুষ মারা যাচ্ছে গুলিবিদ্ধ হয়ে। চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারসহ তুচ্ছ ঘটনার জেরে প্রায়ই বিবাদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে হয়ে থাকে মারামারি। ফলে বেশিরভাগ এলাকায় মজুদ থাকে টেঁটাসহ সবরকমের দেশিয় অস্ত্র।

সংঘর্ষে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার পর পুলিশী অভিযানে উদ্ধারও হয়ে থাকে বিপুল সংখ্যক টেঁটা। বেশ কয়েক বছর ধরে চরাঞ্চলে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও তেমন উদ্ধার তৎপরতা নেই আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস কী বা কারা এসব অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে তারও হদিস
করতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, আধিপত্য বিস্তার ও যেকোন তুচ্ছ ঘটনাকে ঘিরে প্রায়ই সংঘর্ষ হয়ে থাকে নরসিংদী সদর উপজেলার চরাঞ্চল বলে খ্যাত আলোকবালী, চরদীঘলদী, কমিরপুর, নজরপুর এবং রায়পুরা উপজেলার চাঁনপুর, পাড়াতলী, শ্রীনগর, বাঁশগাড়ী, চরমধুয়া, মির্জারচর, চরআড়ালিয়া ও নিলক্ষা ইউনিয়নে। এসব সংঘর্ষে নিজেদের শক্তি দেখানো ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে চরাঞ্চলের প্রায় বাড়িতেই মজুদ রাখা হয় টেঁটা বল্লমসহ দেশিয় অস্ত্র।

তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে পরিবারের নারী- পুরুষ সবাই টেঁটা ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রতিপক্ষের ওপর। ভাড়াটিয়া হিসেবে ও আত্মীয়তার সূত্রে এক ইউনিয়নের লোকজন যোগ দেন অন্য ইউনিয়নের সংঘর্ষে।

নরসিংদী শহর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে অংশ নেয় সন্ত্রাসীরা। স্থানীয়ভাবে উভয় পক্ষেই তৈরি করা হয় ককটেল ও টেঁটা। মৃত্যু, রক্তপাত, পঙ্ধসঢ়;গুত্ববরনের পরও কিছুতেই থামে না এযুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী এসব সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে অঙ্গহানি ও পঙ্ধসঢ়;গুত্ব বরণ করে অনেকের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। অনেক নারী হয়েছেন বিধবা, মা হারিয়েছেন তার ছেলেকে, ছেলে হারিয়েছেন বাবাকে। অবাধে চলে গবাদি পশু, ধানচালসহ বাড়িঘরের মালামাল লুটপাট।

স্থানীয়রা জানান, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শুধু নিলক্ষা ইউনিয়নেই ভয়ানক এই টেঁটাযুদ্ধে মারা গেছেন কমপক্ষে ৪৫ জন। এই ইউনিয়নে অনুসন্ধানে ২৫ জনের নাম ঠিকানাও পেয়েছেন এই প্রতিবেদক। চরাঞ্চলের অশান্ত পরিস্থিতির জেরে বাশঁগাড়ি ও নিলক্ষা ইউনিয়নে এখনও নিখোঁজ বা গুম রয়েছেন ৬ জন।

শতাধিক হত্যাসহ এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিচার হয়নি বেশিরভাগ মামলার। আদালতের পরিবর্তে সমাজপতিরা স্থানীয়ভাবে অর্থদ দিয়েই আপোস মীমাংশা করেছেন এসব খুনের। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও পক্ষপাতদুষ্ট
হওয়ায় শান্তি ফেরাতে কোন ভূমিকা রাখতে পারেন না তারাও। বিবাদমান গ্রুপগুলো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে অশান্ত হয়ে উঠে পুরো চরাঞ্চল। দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন।

সর্বশেষ রোববার (২৭ জুন) দিবাগত রাত ২টার দিকে রায়পুরার পাড়াতলি ইউনিয়নের কাচারিকান্দী গ্রামে প্রতিপক্ষের ২০টি বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও আগুন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসময় হত্যার শিকার হয়েছে আফসানা আক্তার (১৬) নামে
এক তরণী। এর আগে গত ১৭ ও ১৮ মে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২ জন নিহত ও গুলিবিদ্ধসহ ৫০ জন আহত হয়।

এছাড়া গত ঈদের আগের দিন (১৪ মে) থেকে পরবর্তী ৫ দিনে চরাঞ্চলের ৪ ইউনিয়নে ঘটেছে সংঘর্ষ। এরমধ্যে চাঁনপুর ইউনিয়নের মাঝেরচর, পাড়াতলীর কাচারিকান্দি, আলোকবালী ইউনিয়নের বাখরনগর ও নিলক্ষা ইউনিয়নের দড়িগাওয়ে ঘটেছে পুলিশের ওপর হামলাসহ সংঘর্ষের ঘটনা।

এসব ঘটনায় টেঁটা ও গুলিবিদ্ধ হয়ে মাঝেরচর ও কাচারিকান্দিতে ৩ জন নিহত হওয়াসহ আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। লুটপাট ও অগ্নিসযোগে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়িসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ।

প্রতিপক্ষের হামলা ও পুলিশী গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। জেলা প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী জেলা শাখার সহ-সভাপতি রায়পুরার বাসিন্দা মহসিন খোন্দকার বলেন, ৮/১০টি গোষ্ঠীগত দ্বন্ধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভাব, বিচারহীনতাসহ অনেক কারণে চরে যুগযুগ ধরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। আমার জানামতে শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনার একটিরও কোন বিচার হয়নি। সামাজিক মীমাংসার নামে চাঁদাবাজির টাকায় এসব ঘটনা শেষ করা হয়েছে। এতে সংঘাত বেড়েই চলছে।

যোগাযোগ করা হলে নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সাংসদ রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, রায়পুরার চরাঞ্চলে সংঘর্ষের জেরে যেভাবে প্রাণহানিসহ ঘরবাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও এমন বর্বর পরিস্থিতি হয়নি। পুলিশ চরাঞ্চলের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না। চরবাসীসহ আ.লীগ দলীয় নেতাকর্মীরা প্রশাসনের নিকট চর এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করার দাবি জানিয়েছেন।

এজন্য পুলিশের থাকা খাওয়াসহ সব ব্যবস্থা করতে রাজি থাকা সত্তেও পুলিশ কেন ক্যাম্প স্থাপন করছে না সেটা বুঝতে পারছি না। ক্যাম্প স্থাপন না করে সংঘাত থামানো ও জানমাল রক্ষা করা যাবে না।

নরসিংদী আদালতের সরকারি কৌসুঁলী এডভোকেট ফজলুল হক বলেন, বিচার কাজ একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু চরাঞ্চলের বেশিরভাগ ঘটনার সঠিক তদন্ত না হওয়া ও স্থানীয়ভাবে আপস মীমাংশা হয়ে যাওয়ার কারণে মাঝপথে বিচার
প্রক্রিয়া থেমে যায়। ফলে এসব সংঘর্ষের ঘটনায় বিচার হয় না। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে ও আসামীদের বিচারের আওতায় আনা গেলে বিচারহীনতা থাকবে না।

যোগাযোগ করা হলে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইনামুল হক সাগর বলেন, চরাঞ্চলের দীর্ঘ মেয়াদী সংঘাতময় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথেও আলোচনা হয়েছে। চরাঞ্চলে যাতে আর সংঘর্ষ না হয় এ লক্ষে নতুন কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে এবং সেলক্ষে কাজ করছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। আশা করি দ্রতই এই কর্মপরিকল্পনার ফলাফল দেখতে পারবেন।