আমাদের দেশে নদী ও নারী সবচেয়ে বেশী নির্যাতনের শিকার

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 9:26 PM, December 8, 2020

মোঃ আবুল কালাম আজাদ:

#আজ আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশী নির্যাতনের শিকার নদী আর নারী । তাদের রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইন থাকলেও তার প্রয়োগ বাস্তবে যথেষ্ট নয় ।

# বেঁচে থাকার সার্থে নদীকে বাঁচাতে হবে ।

# নদী বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে,ব- দ্বীপ বাাঁচবে, দেশ বাঁচবে ।

# নদী বাঁচলে চলনবিল বাঁচবে, জীববৈচিত্র বাঁচবে ।

# আসুন নদীকে রক্ষা করি নিজেদের বাঁচার তাগিদে ।

আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে নির্যাতন আর বৈষম্যের শিকার নদী ও নারী । তাদের রক্ষা করতে পর্যাপ্ত আইন থাকলেও প্রয়োগ যথেষ্ট নয় । আমরা আমাদের অনেক অমূল্য সম্পদ অবহেলায় হারিয়েছি ।ফলে জাতি হিসেবে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়েছি ।

সমুদ্র বিধৌত ব-দ্বীপ অঞ্চল বাংলাদেশ । নদীমাতৃক শস্য শ্যামলীময় চির সবুজে ঘেরা আমাদের মাতৃভ’মি এই বাংলাদেশ ।হাজার হাজার বছর বিশ্বে কোন নদ-নদীকে রক্ষা করার কোন প্রয়োজন হয়নি । নদী ছিল আপন গতিতে প্রবাহমান ।্ পাহাড়ের চুড়া থেকে নেমে অসংখ জনপদ, প্রান্তর ,বিল, হাওড় ও বনভ’মির ভেতর দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশে গেছে ।তার গতিকে আক্রমন বা বাধা দেওয়ার সাধ্যি ছিলনা কারো । নদ-নদী ছিল অজাত শত্রæ। আজ তারা আন্তর্জাতিক এবং দেশের অগনিত শত্রæ দ্বারা সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত এবং নির্যাতিত ।

চলনবিল বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ চলমান বিল অঞ্চল । পাকভারত উপমহাদেশে চলনবিলের ন্যায় বৃহৎ আয়তনবিশিষ্ট আর কোন বিল আছে বলে ইতিহাসের পাতায় জানা যায়না । নাটোর জেলার গুরুদাসপুর ,সিংড়া, বড়াইগ্রাম,সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়ার আংশিক এবং পাবনা জেলার চাটমোহর, ভা্গংুড়া সহ আটটি উপজেলাব্যাপী বর্তমানে চলনবিল অঞ্চল নামে পরিচিত । চারশত বছর পুবের্ এই বিলটি রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়ার অধিকাংশ জুড়ে বিড়াজ করতো ্ ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার সঙ্গমস্থলের পশ্চিমোত্তর অংশে চলনবিল বিরাজিত । অবস্থান, আকৃতি – প্রকৃতিতে দেখাযায় চলনবিলকে উত্তর বাংলার নদ-নদী ¯œায়ুজলের নাভিকেন্দ্র বলা যায় \

ঐতিহাসিক চলনবিলের জীবনী শক্তি সঞ্চালন করে আত্রাই, বড়াল,নন্দকুঁজা,গুমানী, বেশানী , ভদ্রাবতী,ভাদাই,করতোয়া, ফুলজোড়,তুলসী,চেঁচুয়া, চিকনাই,বানগঙ্গা, গুড়, বারনই মির্জামামুদ, গোহাল,বোয়ালিয়া, কুমারডাঙ্গা সহ বহু সংখ্যক নদ-নদী খাল, খাড়ি, জোলা চলনবিলের মধ্যে দিয়ে শিরা উপ-শিরার মত প্রবাহিত । এর মধ্যে আত্রাই, বড়াল নন্দকুঁজা, ও গুমানী নদী এই বৃহৎ চলনবিলের প্রধান জীবনী শক্তি ।

প্রবাহমান এই সব নদ-নদী, শাখা নদী উপ-নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে জনপদ, হাট-বাজার শহর , শিল্প- কারখানা , ইন্ডাষ্ট্রিজ । যুগের পর যুগ এ সব নদ-নদীগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে । নদীগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারন করে চলেছে । নদীতে বছরের পর অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, রেগুলেটর, রাবারড্যাম নির্মান করে উৎসমুখ বন্ধকরে টুঁটি চিপে মারা হচ্ছে । ঐতিহাসিক বৃহত্তর চলনবিল সহ ছোট-বড় খাল-বিল, শাখা নদী উপ নদীগুলোকে ধীরে ধীরে নির্মম ভাবে মেওে ফেলা হচ্ছে ।ফলে চলনবিলের প্রান সঞ্চালনকারী বড়াল, আত্রাই, নন্দকুঁজা এবং গুমানী নদীতে পানি প্রবাহের উৎসে চরমভাবে টান পড়েছে । রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীর শাখা নদী বড়ালের উৎসমুখে, ভাটিতে আটঘড়িয়ায় বড়াল ও নন্দকঁজা নদীতে তিনটি রেগুলেটর, সাবগারী আত্রাই নদীর উপর বেড়ি বাঁধ , রাবারড্যাম্প নির্মান করে নদী ও চলনবিলকে মেরে ফেলা হয়েছে ।

গত দুই /তিন দশকে নদ-নদীগুলো তাদের প্রানশক্তি হারিয়ে ফেলেছে । নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি বড়াল রক্ষা আন্দোলন, বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) এবং বেলা সংস্থার উদ্যোগে বহু আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার বছরের পর বছর নদ-নদী বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ দিলেও সেসব অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়নি । সময়মত নদীগুলো খনন করা হয়নি । নদী খনন কাজে দক্ষতার অভাবে নদ- নদীগুলোর পলি ও মাটি অপসারনের পরপরই আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে । আত্রাই প্রকল্পের আওতায় পাবনার বেড়া থেকে পঞ্চগড় শুটকিগাছ পর্যন্ত পাবনা, নাটোর, নওগাঁ দিনাজপুর পঞ্চগড়া পযর্যন্ত বড়াল , গুমানী, আত্রাই ১২০ কিলোমিটার নদীর নব্যতা পূনঃরুদ্ধারে ২০১৭ সালের ফেব্রæয়ারীতে খনন কার্য শুরু হয়েছে। কোন যথার্থ জরীপ যাচাই ছাড়াই দুই পাড়ির সীমানা নির্ধারন এবং অবৈধ দখলদার উ্েচ্ছদ না করে খনন কার্য শুরু করে ্ । এর মধ্যে ১৫ কি. মি. খনন কার্য সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবী করেছেন বিআইডবিøউটিএ কর্তৃপক্ষ। যেখানে ২০০/২৫০ ফুট প্রস্থ সেখানে মাত্র ৮০ ফুট প্রস্থে খনন করে নদীর মধ্যেই মাটি রাখা হচ্ছে ।এতে দুই পাড়ের দখলদারদের দখলের আরো সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে । দুঃখের বিষয় হচ্ছে , যেখানে নদীর পাড় থেকে ২০০ থেকে ২০০০ ফুট দুরে মাটি ফেলার কথা সেখানে নদীর মধ্যেই মাটি ফেলায় এখন ঐ মাটিই পুনরায় বৃষ্টি আর ¯্রােতের টানে নদী ভরাট হচ্ছে । এব্যাপারে আমরা নদী রক্ষা এবং বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভাবে প্রতিবাদ জানালে বিআইডবিøউটিএ তাদের দুর্বলতার কথা অকপটে স্বিকার করেন । এমন কী নদীর খননকৃত মাটি না সরানো পর্যন্ত ঠিকাদারের কোন বিল না দেওয়ার প্রতিশ্রæতি দিতে বাধ্য হন । কিন্ত এখনও বাস্তবে করা হয়নাই ।বাস্তবে মূল নদী খনন করে প্রশস্ততা কমিয়ে বানানো হচ্ছে অপ্রশস্ত জোলা বা খাল । এটা একদম দায়িত্বহীনতার কাজ ছাড়া কিছুই না ।

আজ কোন কোন নদীর অস্তিত্ব মানচিত্রে আছে অথচ বাস্তবে নাই । অনেকের লোভ লালসার শিকাওে পরিনত হয়ে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে । নদী দখল করে অনেকে মাছ চাষ করছে । বিভিন্ন স্থাপনা তৈরী করেছে নদীর ওপর । নদীর জমি দখল করে অনেকে নেতা বনে গেছেন । অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যরে লাইন জুড়ে দিয়েছে নদীর সাথে । অনেক স্থানে গৃহাস্থলীর বর্জ্যরে লাইন জুড়ে দিয়েছে নদীতে। আবার কোন কোন স্থনে পৌর শহর, হাট-বাজার, সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলে নদী ভরাট আর দুষন করছে নির্মম ভাবে । শিল্প-কারখানার বর্জ্যে নদী সবচেয়ে বেশী দূষণ হচ্ছে। নদ-নদী দুষন, দখল আর ভরাটের সাথে যারা জড়িত তারা সমাজের অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের এমপি, মন্ত্রী, নেতা। বিভিন্ন সময়ে তারা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নদ-নদীগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে । নদী দখল-দুষনকারীরা এমনই বেপরোয়া যে,তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তাও করেনা । তারা বিবেকহীনের মত প্রকৃতি আর পরিবেশের সাথে যুদ্ধে মেতে উঠেছে । কোন কোন সময় নদীর জমি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ বা বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নদীর তীরের জমি বেদখল হয়ে হাতছাড়া হযে গেছে । আবার সরকারের উদ্যোগে নদীর পাড়ে আবাসন নির্মান করা হয়েছে। নদীর ওপড় এমন নির্যাতন অত্যাচার চলতে থাকলে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশের বদলে নদীমৃত্যুর দেশে পরিনত হতে বেশী সময় লাগবেনা । যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠবে ভয়াবহ।

বিনা বাধায় নদীর পাড় দখলে বাংলাদেশ বিশ্বে অদ্বিতীয় । আবেদন নিবেদন প্রতিবাদে কিচ্ছু হচ্ছেনা । সম্প্রতি হাইকোর্ট এক রায়ে দেশের নদ-নদী রক্ষায় যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন । নদী দখলকারী ব্যাক্তি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, এমনকি জাতীয় সংসদ সহ সব ধরনের নির্বাচনে অযোগ্য হবেন । এধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ব্যাংক ঋন পাবেননা । এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাককে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট । রায়ে আরো বলা হয়েছে, একজন মানুষের যেমন আইনগত অধিকার পাওয়ার সুযোগ আছে,নদ- নদীরও সে ধরনের অধিকার আছে ।

হাইকোর্টৃ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদ-নদীর অভিভাবক ঘোষনা করেছেন । তাই সময় এসছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরো লোকবল, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়ার । এছাড়া নদী বিষয়ে আলাদা ট্রাইবুনাল করলে তা নদ-নদী রক্ষাথের্ ব্যপক ভ’মিকা রাখতে পারবে । নদী পুলিশও গঠন করা যেতে পারে। নদ-নদী তথা প্রকৃতির উপর বছরের পর বছর নির্যাতন অত্যাচার করে কোন সভ্যতা টিকেনি । তাই আমাদের সম্পদ,অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নদ-নদীগুলোকে সুরক্ষা সংরক্ষন এবং সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে মনযোগ দিতে হবে ।

নদ-নদীকে হত্য করা হলে তাকে আর আগের মত ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় । যেমন মৃত মানুষকে আর জীবিত করা যায়না। উচ্চ আদালতের এই রায় বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে নদ-নদী রক্ষায় আমাদের পূনঃ যাত্রা শুরু হবে এই প্রত্যাশা করি ।

# মোঃ আবুল কালাম আজাদ#সভাপতি, চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর