মুজিব জন্মশতবর্ষে স্মৃতির পাতা থেকে-

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 8:09 AM, December 10, 2020

মো. আবুল কালাম আজাদ: মুজিব জন্মশতবর্ষে স্মৃতির পাতা থেকে-
বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ চলছে ২০২০ সালের ১৭
মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বার্ধনতা দিবসের পঞ্চাশ বর্ষ
উদযাপনের দিন পর্যন্ত। এরই মাঝে ১৭ এপ্রিল ২০২০ শুক্রবার
শ্রদ্ধায় উদযাপিত হল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। এই দিবসকে
স্মরন করতে গিয়ে আমার স্মৃতির পাতা থেকে বঙ্গবন্ধুকে কাছথেকে
দেখার কিছু স্মৃতি তুলে ধরতেই এই লেখা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমান আমার প্রিয় নেতা। ১৯৬৯
সালে আমি শিকারপুর প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেনিতে পড়ি। তখন
পুর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবেআমাদেও স্কুলে প্রতিদিন
নিয়মিত এ্যসেম্বলী হত্ধোসঢ়;। শিকারপুর রাশিদিয়া দাখিল মাদরাসা আর
আমাদের প্রাইমারি স্কুল একই ক্যম্পাসে । তাই আমরা মাদ্রাসা আর
প্রাইমারির ছাত্র- শিক্ষক একসাথে চাঁদতারা খচিত সাদা আর সবুজ
কাপড়ের পাকিস্তানী পতাকা জাতীয় সঙ্গিত গেয়ে উত্তোলন করা হত।

জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতেন প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমার
শ্রদ্ধেয় পিতা মো. আব্দুল জাব্বার মিঞা। জাতীয় সঙ্গিত ছিল “
পাক্ধসঢ়;সার জামিন সাদ্ধসঢ়;বাদ্ধসঢ়;/ কিস্ধসঢ়;ওয়ারে হাসিন্ধসঢ়; সাদ্ধসঢ়;বাদ্ধসঢ়;/
তুনিশানে আজমেয়ালী শান্ধসঢ়;/ আরযে পাকিস্তান/ মারকাজে ইয়াকিন
সাদ্ধসঢ়;বাদ্ধসঢ়;..”। কোরআন তেলাওয়াত করতেন সবার প্রিয় ক্কারী মাওলানা
আজাহারুল ইসলাম। আমরা সবই অত্যন্ত দরদ সহকারে জাতীয় সঙ্গিতটি
গাইতাম। মাদরাসার মাষ্টার কাম দপ্তরিজয়নুল আবেদীন জাতীয় সঙ্গিত
শেষে আমাদের পিটি-প্যারেড করাতেন।আমাদের সেকেন্ড স্যার ধীরেন
মাষ্টার আর ফোর্থ স্যার কায়ুম মাষ্টার ছড়ি হাতে পুরা এ্যাসেম্বলির
নেতৃত্ব দিতেন।

চারিদিকে ছাত্রজনতার মিছিল চলছে। দেশব্যাপী গুঞ্জন চলছে বাংলাদেশের
জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী সরকার আগরতলা
ষঢ়যন্ত্র মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দি করে রেখেছে। পুর্ব পাকিস্তানের (
পুর্ববাংলার) সর্ব শ্রেনি- পেশার মানুষ একযোগে প্রিয় নেতা শেখ
মুজিবের মুক্তির দাবিতে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আমাদের গ্রামদিয়ে যখন মিছিল যায় তখন আমরাও স্কুল ফাঁকি দিয়ে, স্কুলে বই
রেখেই পালিয়ে মিছিলে যোগ দিতাম। মিছিলে যোগ দিয়ে সবার
সাথে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে শ্লোগান ধরতাম। শ্লোগান ছিল – ‘
তুমি কে আমি কে- বঙালি বাঙালি, তোমার নেতা , আমার নেতা- শেখ
মুজিব শেখ মুজিব, জেলের তালা ভাঙবো- শেখ মুজিবকে আনবো,
তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার দফা , আমার দফা-
৬দফা, ১১ দফা, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত ও
প্রকম্পিত হয়ে উঠতো এলাকা। যখন জয় বাঙলা শ্লোগান ধরা হতো
তখন সকলের গলার জোর বেড়ে যেত, এ যেন মিছিলে অংশগ্রহনকারিদের
সর্বশক্তির মহাঔষধ।

মিছিল চলার পথে ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে
যেত। আমরা মিছিলের সাথে সাহাপুর-কালিনগর বা চাঁচকৈড় পর্যন্ত
গিয়ে ফিরে স্কুলে এসে বই নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। প্রায়ই এভাবে
মিছিলে জয় বাঙলা শ্লোগান দিয়ে যোগ দিতাম। এজন্য বাড়িতে
এসে প্রায়ই আব্বার হাতের মার এবং বকুনি খেতাম । তারপরও
আমাদেরকে মিছিলে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনাই। মনের
টান এবং দেশপ্রেমই আমাদেরকে মিছিল টেনে নিয়ে গেছে। আমাদেল
শিশু ছাত্রদলে ছিলাম আমিসহ ওযাহেদ, আকরাম, রায়হান, আলাই,
আনোয়ার, লুৎফর, কুদ্দুস , বক্কার,গোলাম, মোজাম্মেল, মাজদারসহ
অনেকে।

১৯৬৯ সালের ২৪ শে মার্চ রেডিও এবং মুখে মুখে প্রচার হয়ে যে,
দেশবাসীর প্রবল আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে প্রাচ্যের লৌহমানব
বলে খ্যাত ফিল্ডমার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান আগরতলা ষঢ়যন্ত্র মামলা তুলে
নিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বিনা শর্তে মুক্তি
দিয়েছেন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে
পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয় গেছেন জনরোষের ভয়ে। প্রেসিডেন্ট

জেনারেল ইয়িিহয়াখান ক্ষমতা পেয়েই জনগনের দাবির পেক্ষিতে ২৫ শে
মার্চ ঘোষনা করেন জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন। আগামি ৭
ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন।
বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষঢ়যন্ত্র
মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি,জেনারেল আইয়ুবের ক্ষমতা হস্তান্তর করে পালায়ন
এবং একই সাথে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনের ঘোষনায় বাঙলার
ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছিল সব বাঙালি আনন্দে মিছিলে
মিছিলে মুখরিত করে তুলেছিল রাজপথ। আমরা শিশুরাও সেদিন থেকে
প্রতিদিনই মিছিল নিয়ে শিকারপুর,সাহাপুর, বাহাদুরপাড়া,
শিকারপাড়ার রাস্তা প্রদক্ষিন করতাম দাপটের সাথে। কিন্তু শিকারপাড়া
মিছিল নিয়ে যেতে আমাদের ভয় করতো। কারন শিকারপাড়া গ্রামে
বাসকরতো আওয়ামী লীগ বিরোধী জামায়াত-মুসলিম লীগ পন্থি আহলে
হাদীস সম্প্রদায়ের ফারাজীরা। তারপরও আমরা শিকারপাড়া গ্রমে মিছিল
নিয়ে যেতাম মারামারির প্রস্ততি নিয়ে। মাঝে মাঝেই ফারাজি ছেলেদের
সাথে আমাদের ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকতো।সেদিনের মিছিলের
শ্লোগান ছিল- ‘ তোমার নেতা আমার নেতা – শেখ মুজিব শেখ
মুজিব, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা , জেলের তালা
ভেঙ্গেছি- শেখ মুজিবকে এনছি, জয় বাঙলা, জয় বঙ্গ বন্ধু’..’।

১৯৭০ সাল। আমি চতুর্থ শ্রেনির ছাত্র। ৭ ই ডিসেম্বর জাতীয় এবং
প্রাদেশিক নির্বাচনের গোটা পাকিস্তানে ব্যাপক তোরজোর চলছে।
আওয়ামী লীগের গুরুদাসপুর থেকে জাতীয় নির্বাচনে সাহাপুর
গ্রামের মো. আব্দুস সালাম সরকার চাঁদ নৌকা মার্কায় এবং
প্রাদেশিক নির্বাচনে সিংড়ার বাহাদুরপুর গ্রামের ডা. মোবারক
হোসেন , জামায়াত থেকে সেকেন্দার হায়াৎ বাঘ মার্কা এবং নাটোর
থেকে কাঁচু উদ্দিন মোক্তার দাঁড়ি পাল্লা এবং মুসলিম লীগ থেকে
চাঁচকৈড়ের আবুল কাশেম মাষ্টার হারিকেন মার্কা নিয়ে
দাঁড়িয়েছেন। আমরা আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট চেয়ে বড়দের সাথে দল
বেঁধে ব্যালট পেপারের নমুনা ব্যালট ও বাক্স নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে
নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছি। ভোটের প্রচার করতে গিয়ে প্রায়দিনই গ্রামেই কারো বাড়িতে খেয়েছি। নৌকা মর্কয় ভোটের
প্রচারে দেখা গেছে একচেটিয়া সমর্থন ছিল। বিপক্ষে কারো কোন
কথা শুনিনাই। এতে খুব মজা পেয়েছি।

এরমধ্যে একদিন শুনি ১৯৭০ সাল ২৩ শে নভেম্বর গুরদাসপুর হাইস্কুল মাঠে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনী প্রচারনায় আসছেন।
তিনি হাইস্কুল মাঠে জনসভায় ভাষন দিবেন। চারিদিকে প্রানপ্রিয়
নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আগমন উপলক্ষে সাজ সাজ রব।

বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী জনসভাকে সফল করার জন্য প্রতিদিনই মিছিল আর মিছিল
চলতে থাকে। মিছিলের শ্লোগান হচ্ছে- জয় বাংলা, শেখ শেখ শেখ
মুজিব- জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, জেলের তালা ভেঙ্গেছি- শেখ মুজিবকে
এনেছি, শেখ মুজিবের নৌকায় – ভোট দিন, ভোট দিন .. ইত্যাদি।
আমরাতো শ্লোগানে শ্লোগানে পাগলপ্রায়। এ যেন দেশপ্রেমের নেশা
পেয়ে বসেছে। ািপ্রয় শ্লোগান- জয় বাঙলা আর নৌকা ছাড়া
আমাদের মুখে আর কোন বুলি নাই।

১৯৭০ সাল ২৩ শে নভেম্বর। সেদিন আর স্কুলে গেলামনা। একমাত্র
শিকারপাড়া ফারাজীদের আলিয়া মাদরাসা ছাড়া আমাদের প্রাইমারি
স্কুল, রাশিদিয়া মাদরাসা সহ মশিন্দা ইউনিয়নের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
গনছুটি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখা এবং তাঁর ভাষন শোনার জন্য আমরা
শিকারপুর থেকে বিশাল মিছিল নিয়ে ব্যানার-ফেষ্টুন হাতে উঁচিয়ে
শ্লোগান দিতে দিতে গুরুদাসপুরে যাই। আমাদের মিছিলে আমি,
ওয়াহেদ আর খলিল সারা রাস্তা টিনের চোঙ মুখে লাগিয়ে শ্লোগান
ধরায়ে দিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমরা সেদিন বড়দের মত একেক জন
পুর্ন নেতা বনে গেয়েছিলাম। এ কথা এখনও স্মৃতিতে জাগলে গর্ব
অনুভব করি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জনসভায় মিছিল নিয়ে যাওয়ার পথে
বহু মিছিল আমাদের সাথে যোগ দিলে মাইলের পর মাইল লম্বা বিশাল
মিছিলে পরিনত হয়্ধসঢ়; গুরুদাসপুরে গিয় দেখি শুধু মানুষ আর মানুষ গিজ
গিজ করছে। চাঁচকৈড় থেকে লোকে লোকারন্য, পা ফেলার জায়গা নাই
জনসমুদ্রে পরিনত হয়েছে। এত লেক সমাগম আমার সেই ক্ষুদ্র জীবনে
কোনদিন দেখিনি। আমার ভয় হচ্ছিল মানুষের পায়ের তলে পিষে প্রান না হারাই। লোকের ভিরে আমি আমার সাথিদেরকে ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছি। তারপরও ভীত না হয়ে আশা ছাড়িনাই। বঙ্গবন্ধুকে দেখবই এবং

তাঁর মুখের ভাষন শুনেই যাব প্রতিজ্ঞা করলাম।
সকাল থেকেই মানুষ গুরুদাসপুর সহ পার্শবর্তী সিংড়া ,
বড়াইগ্রাম, নাটোর, তাড়াশ থেকে মানুষ বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য
এসেছে। প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে। গুরুদাসপুর
হাইস্কুলের মাঠসহ চাঁচকৈড়, গুরুদাসপুর , নারিবাড়ি , ধারাবারিষার
রাস্তায় লোকে লোকারন্য। কোথাও তিলধারনের ঠাঁই নাই। স্কুলের বিশাল
মাঠে মানুষ ধরছেনা তাই বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্যে মানুষ মাঠের
চারপাশের গাছর ডালে, স্কুলের চালে উঠে বসে আছে। কিন্তু দিন যায়
যায় অবস্থা বঙ্গবন্ধু আসছেননা। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছে। মাঝেমধ্যে
মানুষকে চাঙ্গা রাখার জন্য মাইকে বঙ্গবন্ধু এসেছেন (২) বলে গুজব
ছড়ানো হচ্ছে এবং মুহুর্মুহু শ্লোগান দিয়ে জনগনকে চাঙ্গা করে
ধরে রাখছে। মানুষ হুমরি খেয়ে মঞ্চের দিকে দৌড়াচ্ছে।

অবশেষে সত্যি বঙ্গবন্ধু আসলেন বাদ আসর পর সন্ধ্যার আগে।

ইতিমধ্যে দুরের অনেকে ধৈর্য্য হারিয়ে রাতের অন্ধকারের ভয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

বঙ্গবন্ধু একটি হুটখোলা পিকআপে চড়ে মাঠের পুর্ব পাশে নামলেন।
মানুষ সেদিকে বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্যে পাগলের মত দৌড়াতে লাগলো।
আমিও দৌড়ালাম। গাড়ি থেকে নেমে বঙ্গবন্ধু উৎস্যুক মানুষ ঠেলে
মাঠের পশ্চিমে মঞ্চের দিকে জনগনের উদ্দেশে হাত উঁচিয়ে
দ্রæতগতিতে হেঁটে চললেন। ভাগ্যক্রমে আমিও সেই পথে লাইনের সামনে
দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার সামনে দিয়েই তিনি মঞ্চের দিকে চলে
গেলেন। যে নেতাকে দেখার জন্যে এত কষ্ট করে অপেক্ষা করছি সেই
নেতাকে কাছে থেকে দেখতে পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে হয়েছে।
বিশাল আকৃতির বলিষ্ঠ উঁচু লম্বা মানুষ সাদা পাঞ্জাবির ওপড়
হাতকাটা কালো কোট ( মুজিব কোট) গায়ে বীরদর্পে মানুষ ঠেলে
হেটে গিয়ে মঞ্চে উঠলেন। তাঁর সাথে বহু নেতাও মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চে
উঠেই বঙ্গবন্ধু অপেক্ষমান জনসমুদ্রের দিকে দুই হাত উচিয়ে অভিবাদন
জানাতে লাগলেন। জনতাও অভিবাদনের জবাবে শ্লোগানে শ্লোগানে মাঠ মুখরিত করে তুলেছিল। সে সময় আমার কী আনন্দ। বঙ্গবন্ধুকে
কাছেথেকে দেখতে পেয়ে। বঙ্গবন্ধুকে প্রথম কাছে থেকে দেখার গল্প
প্রয়ই বন্ধুদের কছে গর্বের সাথে বলে থাকি।

১৯৭২ সাল । আমি তখন চাঁচকৈড় নাজিমদ্দিন হাইস্কুলের ষষ্ট শ্রেনির
ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধের কারনে সরকারি ঘোষনায় অটো পাশ করে গিয়ে ভর্তি
হয়েছি। আমি বিয়াঘাট মামার বাড়িতে মা’র সাথে বেড়াতে
গেছি। আমার বড় মামা আব্দুল হামিদ প্রামানিক মাষ্টার ও ছোট মামা
বাহার প্রামানিক মেম্বর ছিলেন এলাকার ধনাঢ্য প্রভাবশালী ব্যাক্তিত্ব।
দুই মামার বৈঠকখানায় এলাকার সব প্রধান ও সাধারণ মানুষে ভর্তি হয়ে
থাকতো। চলতো রাজনৈতিক এবং গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক
বিষয়ে আলোচনা। আমি মামাতো ভাইদের চেয়ে একটু ডানপিটে
হওয়ায় মামারা এবং গ্রামে সবাই আমাকে ভালো বাসতো। আমি
প্রায়ই বৈঠকখানার সব আলোচনায় যোগ দিতাম। একদিনের
আলোচনায় জানতে পারলাম, মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের
১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান ৯ ফেব্রæয়ারি নাটোর প্রথম আসছেন। আমি
পাকিস্তান আমল থেকেই বঙ্গবন্ধু এবং জয় বাঙলার নামে পাগল। তার ওপর
বঙ্গবন্ধু আসছেন নাটোরে , আমাকে আর রোখে কে? বায়না ধরলাম
আমিও নাটোর যাব বঙ্গবন্ধুকে দেখতে। আমার জেদের কাছে মামারা
অবশেষে আমাকে সাথে নিতে রাজি হলেন।

১৯৭২ সাল ৯ ফেব্রæয়ারি বিয়াঘাট থেকে প্রায় ৩০/৪০ খানা ছোট-
বড় নৌকা বাইচ মেড়ে দীর্ঘ ২০ মাইল নন্দকুজা নদীর উজান টেনে
হালসা গিয়ে ঘোড়ার গাড়ি টমটমে বা রিক্সায় এবং আহম্মদপুর গিয়ে
বাসে নাটোর যায়। নাটোরে এই আমার প্রথম যাওয়া। কিছুই
চিনিনা। তবে আমার প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে দেখতে সব কষ্টেই আনন্দ
পেয়েছি। সে সময়ে সড়কপথে যাওয়ার কোন সুযোগ না থাকায়
নৌকাই ভরসা। হালসা গিয়ে দেখি শত শত নৌকাভর্তি মানুষ
শ্লোগান দিতে দিতে বাইচ মারছে। আমরা হালসা ঘাটে নেমে কোন
টমটম বা রিক্সা না পেয়ে বিশাল মিছিলের সাথে হেটেই নাটোর

হরিশপুর মাঠে জনসভস্থলে গিয়ে পৌছাই। দীর্ঘ পথ হেটে ক্ষুধায়
ক্লান্ত হয়ে পড়ি। জনসভাস্থলে মাঠের মধ্যে ঢেলের জমিতে এক খোলা
হোটেল থেকে ভাত খেয়ে নেই।
হরিশপুর মাঠে (বর্তমানে বাস টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন
বোর্ডের অফিস) জনসমুদ্রে পরিনত হয়েছে।লোকে লোকারন্য। অনেক
অপেক্ষার পর বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বঙ্গবন্ধু দীঘাপতিয়া রাজবাড়ি
থেকে এসে মঞ্চে উঠেই জনসমুদ্রকে উদ্যেশ্য করে দুই হাত তুলে
একহাত দিয়ে চশমা খুলে আবেগাপ্লুত হয়ে চোখ মুছছেন আর
অভিবাদন জানাচ্ছেন। জনগনও প্রিয় নেতার অভিবাদনের জবাবে দুই হাত
তুলে বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছে। আমি মঞ্চ থেকে কিছুদুরে
দাঁড়িয়ে জনতার সাথে শ্লোগানে তাল মিলাচ্ছি।
নাটোরের ঐতিহাসিক ওই জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন রাজশাহী
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিংড়া আসনের এমসিএ আশরাফুল
ইসলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আমরা সামান্য ভাষন শুনেই তাড়াতাড়ি
হেটে মিছিল করে হালসা এসে নৌকায় বিয়াঘাট মামার বাড়ি
আসি। ভাটিরটানে নৌকায় আসতে অনেক রাত হয়েছিল।

স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালের ২৩ শে নভেম্বর গুরুদাসপুর হাইস্কুলমাঠে
পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনী জনসভায়
এবং ১৯৭২ সালে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন
হওয়ার ২ মাস পর পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে সদ্য মুক্তির একমাসের
মাথায় মুক্তিকামি বাঙালীর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে
কাছে থেকে দেখা সুযোগ হওয়ায় আমি সত্যিই ভাগ্যবান এবং
গর্বিত। দুঃখের বিষয় সেই মঞ্চ দীর্ঘদিন মহাসড়কের উত্তর পাশে
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বহন করে আসছিল । বর্তমানে যেখানে বিদ্যুৎ উন্নয়ন
বোর্ডের ভবন এবং বাস টার্মিনাল নির্মান করে সেই ঐতিহাসিক
স্মৃতিচিহ্নটি ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। মুজিব জন্মমতবর্ষে
নাটোরের গুরুদাসপুর পাইলট মডেল সরকারি হাইস্কুল মাঠে এবং
হরিশপুরের সেই স্থানে পুনরায় স্থায়ীমঞ্চ তৈরী করে মুজিবমঞ্চ নামকরণে
বঙ্গবন্ধুরস্মৃতি সংরক্ষন করা হোক এই দাবী জানাচ্ছি।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপ ও লজ্জার বিষয় সেই জাতির পিতাকে পাকিস্তানের
প্রেতাত্মার দোষর কিছু বিপথগামীরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট
নির্মমভাবে স্বপরিবারে হত্যা করে জাতির কপালে কলঙ্কের তিলক পড়ায়ে
দেয়। বিশে^র কাছে আমাদের পরিচয় হয় জাতির পিতা হন্তারক ঘৃন্য
জাতি হিসেবে। বিশ^ তাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী হিসেবে
স্বীকৃতি দেয়।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা
আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই কুখ্যাত খুনিদের
বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড
কার্যকর করায় জাতি আজ বিশে^র দরবারে অনেকটাই কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে চলছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ
বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী ‘
মুজিববর্ষ’ উদযাপনের বছর। সারাবিশে^ মুজিবশতবর্ষ পালনের জন্য
ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া সত্তে¡ও দুর্ভাগ্যবশতঃ বিশ^ব্যাপী প্রানঘাতি
করোনাভাইরাসের বৈশি^ক মহামারির বিশ^ব্যাপী আতঙ্কের কারণে
উদযাপন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।

আগামী ২০২১ সালের ২৬ মার্চ
পর্যন্ত মুজিব জন্মশতবার্ষিকীটি উদযাপিত হবে বলে সরকারি ও
দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শুভ হোক মুজিব জন্ম শতবর্ষ । সেই
সাথে ১৭ এপ্রিল উদযাপিত হল ঐতিহাসিক মুজিব নগর দিবস।
মুজিব নগর দিবসটিকে জানাই সশ্রদ্ধ স্যালুট।
লেখক- চলনবিল প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কলাম লেখক।
# মো. আবুল কালাম আজাদ