প্রসঙ্গ: গুরুদাসপুররে স্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং…

CNNWorld24
CNNWorld24 Dhaka
প্রকাশিত: 6:44 PM, January 1, 2021

আবুল কালাম আজাদ: মানবসৃষ্ট এই দুর্যোগ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে চাপিলা ও নাজিরপুর ইউনিয়নের স্থায়ী জলাবদ্ধতা  দুর করতে হলে একমাত্র উপায় -তুলসীগঙ্গা , মির্জামামুদ  এবং বোয়ালিয়া নদী জরুরী ভিত্তিতে  সিএস রেকর্ডমুলে জরিপ করে সিমানা নির্ধারন করে পিলার পুঁতে অবৈধ স্থাপনা ও দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে ।

নদী তিন টি পুনঃ খনন করে পানি নিষ্কাশনের জোড়ালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঐতিহাসিক চলনবিলের প্রণকেন্দ্র গুরুদাসপুর উপজেলা। নাটোরের এই উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৮৮্ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১লাখ ৭হাজর ৫২০ জন এবং নারী ১লাখ ৭হাজার ২৬৮ জন। মোট আয়তন ৭৮ বর্গ কিলোমিটার( ৫০ হাজার ২১৪ একর), মোট খানার সংখ্যা ৫৮ হাজার ৩৭৯টি। ভুমি অফিসের তথ্যমতে উপজেলায় নদ-নদীর সংখ্যা ৮টি (আর এস নকসা হিসেবে)। নদী ৮টি হচ্ছে-গুমানী নদী দৈর্ঘ্য ১৪.৫০ কি.মি. নন্দকুজা দৈর্ঘ্য-১৬.৫ কি.মি. আত্রাই দৈর্ঘ্য ১৫ কি.মি. বেসানী ৩ কি.মি. তুলসীগঙ্গা ৫কি.মি. গুড় ৩ কি.মি. খুবজিপুর ৩ কি.মি.  এবং মির্জামামুদ নদী ৪ কি. মিটার দৈর্ঘ্য। কিন্তু বোয়ালিয়া নদী মানচিত্র থেকে সম্পুর্ন হাড়িয়ে গেছে।  পুকুর সংখ্যা  উপজেলা মৎস অফিসের হিসেবে  ৬৩৬২টি, যার আয়তন ১হাজার ৮০০ হেক্টর গত বছরে ছিল ৫৪৩৫টি , বেসরকারী হিসেবে বর্তমানে পুকুর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশী।

উপজেলার  মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ৯টি নদীর মেেধ্যে  নন্দকুজা, আত্রাই, গুমানী ও বেসানী নদী  প্রভাবশালী  নদী খেকোদের দখল-দুষনের নির্মম ঝঁুকির ধাক্কা সহ্য করেও আধমরা হয়ে কোনরকম চলমান। কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে চাপিলা ও নাজিরপুর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এককালের প্রমত্মা  তুলসীগঙ্গা , মির্জামামুদ ও বোয়ালিয়া নদী প্রভাবশালী নদী খেকোদের দখল- নির্যাতনের  নির্মম মরন কামড় সহ্য করতে না পেরে একেবারেই মরে গেছে বললে ভুল হবে না।

দখলদারেরা নদীর হাড্ডি হুড্ডি সবই সাবার করেছে। শুধু নদী খেকোদের দোষ দিলে আবারো ভুল হবে, এর সাথে জড়িত ভুমি অফিসের অসাধু কর্মকতার্দের কারিশমা। টাকার বিনিময়ে রাতারাতি ভুয়া কাগজপত্র তৈরী করে বনে গেছে বৈধ মালিক আর অফিসাররা হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। এ দুটি নদীর উপর গড়ে উঠেছে পুকুর,মসজিদ,মাদ্রাসা, বসতবাড়ি , পাকা ইমারত , রাস্তা,ইত্যাদি। সিএস ,এসএ রেকর্ডে নকসায় নদী থাকলেও আরএস রেকর্ডে নকসায় অদৃশ্য শক্তির ছেঁায়ায় প্রবাহমান নদীর অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছে। কথায় আছে ‘ নদী মরে গেলেও তার ধারা থাকে’।  এখন সেই ধারাই  জানান দিচ্ছে‘ এখানে এক নদী ছিল জানলোনাতো কেউ’। এই তুলসীগঙ্গা ও মির্জামামুদ নদী দিয়ে চন্দ্রপুর, মহারাজপুর,লক্ষ্মিপুর,গোপীনাথপুর,বৃকাশো,খামার পাথুরিয়া,নওপাড়া,বৃগড়িলা,বৃপাথুরিয়া এবং চাকলের বিলের পানি নিষ্কাশন হতো। মুরব্বিদের কাছে শোনা যায় এই দুই নদী দিয়ে এক সময় বড় নৌকা , বজরা এবং লঞ্চ চলাচল করতো। এখন সেই নদীর বুকে  মাটি দিযে ভরাট করে পাকা মসজিদ,মাদ্রাসা, বসতবাড়ি নির্মান হয়েছে।

পুকুর খনন করে মাছ চাষ এবং কৃষি আবাদ হচ্ছে।
এখন গুরুদাসপুর উপজেলায় চলছে মাছ চাষের উন্নয়নের জোয়ার। মাছ এবং কলা চাষের অর্থনৈতিক জোন হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে দেশে।পরিকল্পনা হচ্ছে গুরুদাসপুরের জীবন্ত মাছ বিদেশে রপ্তানির।  আসবে বৈদেশিক মুদ্রা, গড়বে  সমৃদ্ধ বাঙলাদেশ। চলছে প্রতিযোগীতা চলছে পুকুর খননের মহোৎসব। পুকুর গিলছে কৃষি জমি ,নদী,নালা, খাল-বিল আর জলাশয়।মানা হচ্ছেনা সরকারী আইন-কানুন, বিধি-বিধান। অভিযোগ আছে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকতার্ থেকে নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারিরা পরোক্ষভাবে পুকুর খননে সহযোগিতা করেছেন ।

প্রতিরোধে স্থানীয় নদীরক্ষা আন্দোলন , চলনবিল রক্ষা আন্দোলন, পরিবেশ বাঁাচাও আন্দোলন,সচেতন নাগরিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন এবং মৎসজীবি কমিটি  নানা ভাবে প্রতিবাদ জানালেও  প্রশাসনের অনৈতিক আচরনে  প্রভাবশালীদের কাছে অপ্রতিরোধ্য থেকে গেছে। এমনকি স্থানীয়  সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস এই অপ্রতিরোধ্য পুকুর খননের  বেপরোয়া কর্মযজ্ঞ বন্ধে বিভিন্ন সময়ে মিটিং করে নদী নালা দখল করে অবৈধ স্থাপনা  উচ্ছেদ এবং কৃষি জমিতে পুকুর খনন প্রতিরোধ করার জন্য জন সচেতনতামুলক মাইকিং করেছেন, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদেরকে এবং প্রশসনকে কঠোর ভাষায় নির্দেশ দিয়েও  ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজ হাতে  স্পটে গিয়ে পুকুর খননের যন্ত্র এক্মেভেটর জব্দ করেছেন, পুড়িয়ে দিয়েছেন। তারপরও থেমে নাই পুকুর খননের কর্মতৎপরতা।

এ অপতৎপরতা   মাননীয় হাইকোর্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা  বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার – রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এলাকার জনগনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
অপরিকল্পিত ভাবে যত্রতত্র পুকুর খননের ফলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে  উপজেলার চাপিলা আর নাজিরপুর ইউনিয়নবাসী।বেপরোয়া  খননকৃত পুকুরের চাপে পরে কৃষি জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃস্টি হয়েছে।

ফলে  জলাবদ্ধ জমিতে কোন ফসলের আবাদ করা যাচ্ছেনা। এদিকে নদী খেকোদের অবৈধ দখলের ফলে তুলসী গঙ্গা , মির্জামামুদ  এবং বোয়ালিয়া নদী অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলায় পানি নিস্কাশনের পথ  সম্পুর্ন বন্ধ হয়ে গেছে। নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ না থাকায় নাজিরপুর এবং চাপিলা এই দুই ইউনিয়নের মহারাজপুর,বৃ পাথুরিয়া, বৃগড়িলা, বৃকাশো,পশ্চিম নওপাড়া, চাপিলা,রানীনগর, লক্ষীপুর,খামার পাথুরিয়াসহ এলাকার বিভিন্ন গ্রাম এবং চাকলে বিলে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ থাকায় সারা বছর পানিতে ডুবে থাকে। এর প্রভাবে চাপিলা ও নাজিরপুর ইউনিয়নের  মুল্যবান  কৃষিজমি,অভ্যন্তরীন রাস্তা,পাকা সড়ক, ফলজ ও বনজ বাগান,শ্াক-সব্জির বাগান, বাড়িঘর স্কুলমাঠ ( পাথুরিয়া হাইস্কুল ও প্রইমারী স্কুল,মহারাজপুর মাদরাসা ও প্রাইমারি স্কুল মহারাজপুর বাজার এবং উপল শহর হাই স্কুল, মাদ্রাসা ও প্রাইমারি স্কুল) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পানির নীচে ডুবে থাকায় কৃষি আবাদ সম্পুর্নভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

এলাকার ছেলে-মেয়েদের লেখপড়া ব্যহত হচ্ছে। এসব এলাকায় অস্বাস্য্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। পানিবাহিত রোগ ছড়াচ্ছে, পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, মশার উপদ্রপ বেড়েছে, ফলজ ও বনজ বাগান এবং বঁাশবাগান  সুপারি বাগান ধ্বংস হয়ে গেছে,বসত ভিটায় কোন শাক-সব্জির চাষ ,  গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি পালন করতে পারছেনা।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা বন্ধ হয়েগেছে, রাস্তা চলাচল অনুপযোগী হয়েগেছে সবমিলে প্রাকৃতিক পরিবেশ দুষিত হয়ে মানুষ বসবাসের  সম্পুর্ন অনুপযোগী এবং মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগে জনজীবন পুর্ণ হয়ে পড়েছে। যে কোন সময় জনজীবনে মহামারি আকার ধারন করতে পারে।

তাই উল্লেখিত সমস্যা নিরসনে -তুলসীগঙ্গা , মির্জামামুদ  এবং বোয়ালিয়া নদী জরুরী ভিত্তিতে  সিএস রেকর্ডমুলে জরপি করে সিমানা চিহ্নিত করে পিলার পুঁতে অবৈধ স্থাপনা ও দখলদার উচ্ছেদ ও নদী তিনটি পুনঃখনন করে পানি নিষ্কাশনের জোড়ালো পদক্ষেপ নেয়া খুবী জরুরী। এতে  বড়াইগ্রাম  উপজেলার জোয়ারি ইউনিয়ন এবং গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা , নাজিরপুর ও ধারাবারিষা ইউনিয়নের জলাবদ্ধতার অবশান হবে এবং বিপুল পরিমান কৃষি জমি উদ্ধার হবে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরে আসবে বলে  এলাকার ভূক্তভূগীদের দাবী। এ দাবী জানিয়ে ওই এলাকার জনসাধারন সরকারের কাছে বার বার আবেদন জানালেও কাজ হচ্ছেনা। সে কারনে ভূক্তভূগীজনগন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ একান্তভাবে কামনা করছেন।

বি:দ্র: লেখকের পরবর্তী লেখা-“চলনবিল মরা বিল”। দেখতে চোখ রাখুন  (সিএনএনওয়ার্ল্ড২৪,কম
মোঃ আবুল কালাম আজাদ, সভাপতি , চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর,নাটোর।