কুরআন’র আলোকে মানব জীবন

Desk Reporter
Desk Reporter
প্রকাশিত: ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০২১

ইসলাম ডেস্ক: পার্থিব জীবনের পরে একটি অন্তহীন জীবন মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে। সেই জীবন চিরন্তন ও অনন্ত। বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মে মৃত্যু’র পরে এই জীবনের স্বীকৃতি রয়েছে।

একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি এই পৃথিবীতে পরকালের জন্য প্রস্তুত থাকে। কারণ মৃত্যু অপরিহার্য এবং পরকালে মুক্তি হ’ল সাফল্যের মাপকাঠি। ইরশাদ রয়েছে , ‘কেবল জীবমাত্রই মৃ’ত্যু’র স্বাদ গ্রহণ করবে। কিয়ামতের দিন তোমাদের আমলগুলি/ কর্মফল সম্পূর্ণভাবে আদায় করা হবে। যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে রাখা হবে এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে তার সেই সফল কর্ম। দুনিয়ার জীবন কল্পনাময় ভোগ বিলাস ছাড়া কিছুই নয়। ‘(সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

‘ আত্মা ’ – একটি দুর্দান্ত বিস্ময়: জীবের জীবন ও মৃত্যুর ভিত্তি হ’ল ‘রুহ’ বা আত্মা। পবিত্র কোরআনে ‘আত্মা’ মহান স্রষ্টার অসীম আশ্চর্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ রয়েছে যে , ‘তারা আপনাকে আত্মার বিষয়ে প্রশ্ন করে- বলুন! আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আদে্তি, কেবল তোমাদের সামান্য জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। ‘(সূরা বনী ইসরাঈ’ল, আয়াত: ৮৫)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, “উপরের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে আত্মা কেবলমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার অধীন এবং পৃথিবীর খুব কম লোকই এ সম্পর্কে খুব কম জ্ঞান রাখে।” (তাফসীর ইবনে কাসির)

জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর ইচ্ছার দ্বারা নির্ধারিত: জীবন ও মৃত্যু’র সীমারেখা পরাক্রমশালী আল্লাহ’র ইচ্ছা দ্বারা নির্ধারিত হয়। ইরশাদ রয়ছে যে , ‘তিনি জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু ঘটান। আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক বা সাহায্যকারী নেই। (সূরা তাওবা, আয়াত : ১১৬)

জীবনকাল- নির্ধারন: মানুষের জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহ হুকুমে নির্ধারিত হয়। ইরশাদ রয়েছে, ‘আমি তোমাদের মধ্যে মৃত্যুকে নির্ধারণ করেছি এবং আমি অক্ষম নই।’ (সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত: ৬০)

অন্য একটি আয়াতে ইরশাদ রয়েছে, ‘-অবশ্যই যখন আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময় আসে তখন আর দেরি হয় না,তোমরা যদি কেবল জানতে! ‘(সূরা নূহ, আয়াত ৪)

মানুষের জীবন কেন এই জীবন-মৃত্যু : এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন ও মৃত্যু নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে পরীক্ষা করার জন্য । ইরশাদ রয়েছে, ‘যিনি আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য মৃত্যু এবং জীবন সৃষ্টি করেছে – তোমাদের মধ্যে কে উত্তম কাজ করেন? তিনি সর্বশক্তিমান, ক্ষমাশীল। ‘(সূরা মুলক, আয়াত ২)

জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে ঘুম মধ্যবর্তী এক অবস্থা: ঘুম জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে একটি মধ্যবর্তী এক অবস্থা। ইরশাদ রয়েছে, ‘আল্লাহ জীবিত প্রাণীদের জীবন গ্রহণ করেন- তাদের মৃত্যুর সময় এবং যারা মারা যান না তাদের আত্মারাও ঘুমের সময়। অতঃপর তিনি যার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেন তার প্রাণ বাঁচান এবং অন্যকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন।'(সূরা জুমুআহ, আয়াত: ৪২)

মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়: মৃত্যু জীবনের শেষ নয়- এর পরেও দীর্ঘ জীবন রয়েছে। ইরশাদ রয়েছে, ‘তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করবে? অথচ তোমরা যখন প্রাণহীন ছিলে, তিনি তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন। তিনিই তোমাদেরকে আবার মৃত্যু দেবেন এবং তোমাদের পুনরুত্থিত করবেন- চূড়ান্ত পরিণতিতে তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। ‘(সুরতুল বাকারা, আয়াত ২৮)

বিশ্বাসীদের মৃত্যু-চিন্তা : মৃত্যু অনিবার্য-তবে মুমিন কখনও মৃত্যুর করবে করবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর কামনা করে না, সে মৃত্যুর আগমনের পূর্বে যেন সে জন্য দোয়া না করে। কারণ সে মারা গেলে তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আর আয়ু বাড়ার সাথে সাথে মুমিনদের কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। ‘(সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৬৮২)

নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউই যেন মৃত্যুর কামনা না করে। কারণ সে যদি সত্যবাদী হয়, বেঁচে থাকলে হয়তো সে তার সৎকর্মকে বৃদ্ধি করবে। আর যদি সে পাপী হয় তবে হয়তো সে তাওবা করবে। ‘(সহিহ বুখারী, হাদীস: ৭২৩৫)

কাফেরদের মৃত্যু-চিন্তা: পরকালে বিশ্বাস না করে তারা মৃত্যুকে ভয় করে এবং মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়ায়। ইরশাদ রয়েছে, ‘তবে তাদের হাত আগে যা পাঠিয়েছিল, তার কারণে তারা কখনও মৃত্যুর জন্য কামনা করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ যালেমদের সম্পর্কে অবহিত। বলুন! তোমরা যে মৃত্যু থেকে পলায়ন করো তা অবশ্যই আপনার সাথে দেখা করবে। অতঃপর তোমাদের আল্লাহর কাছে উপস্থাপিত করা হবে, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা /দৃষ্টির জ্ঞানী এবং তোমাদেরকে জানানো হবে তোমরা যা কর। ‘(সূরা জুমআহ, আয়াত -৭-৮)

যারা পৃথিবীতে জীবিত থেকেও মৃত : পৃথিবীতে জীবন ধারণ করা এবং বিচরণ করার অর্থ বেঁচে থাকার অর্থ নয়; বরং সত্যিকারের বাস্তব জীবন মানুষের অনুভূতি, বিশ্বাস এবং আচরণে প্রকাশিত হয়। পবিত্র কুরআন এমন অজ্ঞ লোকদের মৃত বলে অভিহিত কর হয়েছে। ইরশাদ রয়েছে,- ‘নিশ্চয়ই আপনি মৃতদের কোন কথা শুনতে পারবেন না।’ (সূরা নমল, আয়াত: ৮)

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ অবিশ্বাসীকে একজন মৃত ব্যক্তির সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, “যে ব্যক্তি মৃত ছিল তাকেই আমি পরে পুনরুত্থিত করেছি এবং আলো দিয়েছি মানুষের মধ্যে চলবার জন্য-সে ব্যক্তি কি ওই ব্যক্তির মতো যে অন্ধকারে রয়েছে ? এবং সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আলোকপাত করেছি ” (সূরাঃ আনআম,- আয়াত : ১২২)

যারা মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকে : পৃথিবীতে বিচরণ করার সময় যেমন একদল লোক মারা যায়, তেমনি একদল মানুষ মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে। পবিত্র কোরআননে ইরশাদ রয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে (শহীদ হয়েছে) তাদের মৃত বলো না; -বরং তারা বেঁচে আছে। তবে তোমরা তা অনুভব করো না। ‘(সুরা- বাকারা, আয়াত: ১৫৪)

মুমিনের মৃত্যু’র প্রস্তুতি: মুমিনের মূল লক্ষ্য পরকালে। তাই তিনি পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেন। ইরশাদ রহয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে যথাযথ সম্মানের সাথে ভয় কর। আর তোমরা মুমিন না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না, যদি না তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাক। ‘(সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১০২)

আল্লাহর জন্য মুমিনের জীবন ও মৃত্যু: একজন বিশ্বাসী ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই বেঁচে থাকে এবং তাঁর জন্যই মৃত্যু বরণ করেন । ইরশাদ রয়েছে , ‘বলুন! আমার প্রার্থনা, আমার ইবাদত, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর জন্য(নিবেদিত)। ‘(সূরা; আনআম, আয়াত : ১৬২)

পরকালে জীবন অমর: পরকালে জীবন অমর হবে। অনিন্দ্য সুখের মাঝে জান্নাতবাসীও অন্তহীন জীবন পাবে। অন্যদিকে জাহান্নামের লোকেরা শাস্তি থেকে বাঁচতে মৃত্যুর কামনা করবে। তবে তারা মারা যাবে না। ইরশাদ রয়েছে, ‘যখন তাদের শৃঙ্খলিতভাবে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামে সংকীর্ণ স্থানে,তারা তখন ধ্বংস/ (মৃত্যু) কামনা করবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলা হবে, আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস-মৃ’ত্যু কামনা কোরো না; বরং বহুবার ধ্বংস/মৃ’ত্যু হওয়ার কামনা করতে থাকো।’ (সূরা ফোরকান, আয়াত : ১৩-১৪)